করোনায় মৃত্যুবরণ করা প্রথম বাংলাদেশী চিকিৎসক ডা. মঈন উদ্দিন:
ডা. মঈন ৫ এপ্রিল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছিলেন সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল। বুধবার প্রেমানন্দ মন্ডল বলেন, কিভাবে তিনি সংক্রমিত হয়েছেন এটা সনাক্ত করা খুব শক্ত। তিনি ধারণা করেছিলেন ড. মঈন প্রবাসী স্বজনদের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু খুজ নিয়ে দেখা যায় ডা মঈন সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের বাইরেও যাননি, দেশে আসেননি তার কোনো প্রবাসি স্বজনও ।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম বাংলাদেশী ডাক্তার:
এসময় সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মণ্ডল আরোও বলেন, আমরা তার পরিবার ও কর্মস্থলের ১২ জনকে টেস্ট করিয়েছি। কারো পজেটিভ ধরা পড়েনি। এছাড়া এই সময়ে সিলেটে আর কোনো রোগীও সনাক্ত হয়নি।
আরোও পড়ুন: দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা
এদিকে জানা যায়, অসুস্থ বোধ করার পর নিজেকে হোম কোয়ারেন্টিন করে রাখেন ডা. মঈন উদ্দিন। চলতি মাসে চেম্বারে বসেন তিনি। আগে প্রতি সকালে নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় মর্নিং ওয়াক করলেও তাও বন্ধ রেখেছিলেন। ৫ এপ্রিল যখন তিনি করোনা আক্রান্ত হিসেবে সনাক্ত হন তখন হাউজিং এস্টেটের নিজ বাসায় ছিলেন ডা. মঈন।
সেখানে শারিরীক অবস্থার অবনতি হলে ৭ এপ্রিল রাতে তাকে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি করা হয়। প্রথমে হাসপাতালের আইসিইউতে নেয়া হলেও পরে সাড়ে ১১টার দিকে কেবিনে নিয়ে আসা হয়।
এই হাসপাতালটি ওসমানী হাসপাতালের অধীন একটি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল এবং করোনা আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে ঘোষণার পর একটি দুই শয্যার আইসিইউ ইউনিট এখানে স্থাপন করা হয়েছে।
হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুশান্ত কুমার মহাপাত্র বলেন, ‘ডা. মঈন উদ্দিনের শারীরিক অবস্থা আইসিইউতে রাখার মতো খারাপ ছিল না। অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়ার পর তার অবস্থা স্বাভাবিকই ছিল। যেহেতু এখানকার আইসিইউ নতুন, আর ওসমানী মেডিকেলের আইসিইউ অনেকদিন ধরে সচল; তাই তিনি প্রথমে সেখানে যেতে চান। কিন্তু সেখানে তাকে ভর্তি না করতে পারায় তিনি ঢাকায় যেতে চান।’
সরকারি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় তিনি বেসরকারি একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে ঢাকায় যান:
তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু ওসমানী মেডিকেলের আইসিইউতে সব ধরণের রোগী আছেন, তাই এখানে ডা. মঈনকে ভর্তি করা যায়নি। পরে তিনি ঢাকায় যেতে চাইলে আমরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাকে ঢাকায় রেফার করি। সরকারি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় তিনি বেসরকারি একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে ঢাকায় যান।
তবে হাসপাতাল ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এ বক্তব্যের পরেও ডা. মঈনের সহকর্মী ও অন্যান্য ডাক্তারদের দাবি, কর্তৃপক্ষ চাইলে ওসমানী মেডিকেলের আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া যেতো তাকে।
১৫ এপ্রিল বুধবার ভোর সাড়ে ৪টায় ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে মারা যান ডা. মঈন উদ্দিন:
৮ এপ্রিল তাঁকে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার আরো অবনতি হওয়ায় গত সোমবার হাসপাতালের লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।বুধবার(১৫ এপ্রিল) ভোর সাড়ে ৪টায় ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে মারা যান ডা. মঈন উদ্দিন।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) দুপুর ২টার দিকে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে তার মরদেহ ঢাকা থেকে নিয়ে রওনা হন পরিবারের সদস্যরা।
নিজ গ্রামে বাবা-মায়ের পাশেই শায়িত হলেন করোনায় মৃত্যুবরণ করা প্রথম চিকিৎসক ডা. মঈন উদ্দিন। মারা যাওয়ার আগে শেষ ইচ্ছানুযায়ী তার মরদেহ সুনামগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিন রাত ৮টার দিকে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার উত্তরখুরমা নাদামপুর গ্রামের বাড়িতে পরিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।
ডা. মঈন উদ্দিনের পরিচয়:
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. মঈন উদ্দিন ওই গ্রামের মরহুম মুন্সি শিকদার আলীর ছেলে।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান রেখে গেছেন। তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার নাদামপুর গ্রামে। তিন ভাইয়ের মধ্যে ডা. মঈন উদ্দিনের বড় দুই ভাই আগেই মারা যান। তিন বোন রয়েছেন শিক্ষকতা পেশায়। তার স্ত্রী পার্ক ভিউ মেডিক্যাল কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. ইফ্ফাত জাহান। তার শ্বশুর নুর আহমদ এবং শাশুড়িও চিকিৎসক ছিলেন। তার বাবা মরহুম মুন্সি সিকদার আলী একজন আলেম ছিলেন।
ডা. মঈন উদ্দিনের জানাজা নামাজ:
সুনামগঞ্জের ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল এতথ্য নিশ্চিত করে বলেন, প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ধর্মীয় রীতি মেনে জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। নিজ বাড়িতে ডা. মঈন উদ্দিনের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা ও মায়ের কবরের পাশে শায়িত করা হয়েছে। জানাজায় পাঁচ জন মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন। জানাজা নামাজে ইমামতি করেন ডা. মঈন উদ্দিনের চাচাতো ভাই পোস্ট মাস্টার ইসরাইল মিয়া।
জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছাতক উপজেলার ভূমি কর্মকর্তা তাপস শীল, এএসপি সার্কেল বিল্লাল হোসেন, ওসি মোস্তফা কামাল প্রমুখ।
এলাকার লোকজন জানান, এলাকার মানুষের জানাজায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণের আতঙ্কে তাদের সে সুযোগ দেওয়া হয়নি। মরদেহ ঢাকা থেকে নিয়ে আসার পর পরই জানাজার নামাজ পড়ে দ্রুত মরদেহ দাফন করা হয়।
ডা. মঈন উদ্দিনের শিক্ষাজীবন:
মেধাবী চিকিৎসক ডা. মঈন উদ্দিন মেডিসিনের পাশাপাশি কার্ডিওলজিরও চিকিৎসক ছিলেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ১৯৯৮ সালে তিনি এফসিপিএস’র পাশাপাশি কার্ডিওলজিতে এমডি করেন।
তার শিক্ষাজীবন শুরু ছাতকের উত্তর খুরমা ইউনিয়নের নাদামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে স্থানীয় ধারণ নতুন বাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি এবং সিলেটের এমসি কলেজ থেকে ১৯৯০ সালে এইচএসসি পাস করেন।
এরপর ভর্তি হন ঢাকা মেডিক্যালে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এমবিবিএস পাসের পর তিনি এফসিপিএস ও এমডি কোর্স সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন।
স্বাস্থ্য ক্যাডারে মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালের ২০ মে তিনি এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ কলেজে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতি শুক্রবার এলাকায় বিনা পয়সায় রোগী দেখতেন তিনি। যে কারণে এলাকায় তিনি গরীবের চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত।












