ঐতিহাসিক মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২২তম বার্ষিকীতে বিভিন্ন সংগঠনের মানববন্ধন

0
160
ঐতিহাসিক মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২২তম বার্ষিকীতে বিভিন্ন সংগঠনের মানববন্ধন
ঐতিহাসিক মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২২তম বার্ষিকীতে বিভিন্ন সংগঠনের মানববন্ধন

স্টাফ রিপোর্টার: আজ ১৪ই জুন শুক্রবার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ঐতিহাসিক মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২২তম বার্ষিকী। আজকের এই দিনে ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মাগুরছড়া গ্যাস কূপে কাজ চলাকালে রাত ১টা ৪৫ মিনিটে বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে ছিল গোটা কমলগঞ্জ।

দীর্ঘ ২২ বছরেও মার্কিন তেল গ্যাস উত্তোলনকারী সংস্থা অক্সিডেন্টাল, ইউনিকল বা শেভরন আজ পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ দেয়নি।এসময় তদন্ত প্রতিবেদনে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা।

মাগুরছড়া গ্যাস কূপ বিস্ফোরণের ২২তম বার্ষিকীতে শুক্রবার (১৪ই জুন) বেলা সাড়ে ১১টায় কমলগঞ্জ উন্নয়ন পরিষদ, কমলগঞ্জ জীব বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি ও কমলগঞ্জ পাহাড় উন্নয়ন ও রক্ষা কমিটি যৌথভাবে মাগুরছড়া গ্যাস কূপ বিস্ফোরিত এলাকার পাশে কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কে ক্ষতিপূরণ দাবি করে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে।

এসময় এই মানববন্ধন কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন পাহাড় রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক নির্মল এস পলাশের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সুজন কমলগঞ্জ উপজেলা শাখার সম্পাদক প্রভাষক রাবেয়া খাতুন, পাহাড় রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সালাউদ্দিন আহমদ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বিকুল চক্রবর্তী, কমলগঞ্জ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক এম, এ, ওয়াহিদ রুলু, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী কমলগঞ্জ শাখার সহ সভাপতি সাংবাদিক প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, দৈনিক মানব জমিন কমলগঞ্জ প্রতিনিধি সাজিদুর রহমান সাজু, কমলকুঁড়ি সম্পাদক পিন্টু দেবনাথ, বিশ্ববার্তা অনলাই সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদক মো: কামরুজ্জামান, কমলগঞ্জ প্রেসক্লাবের ক্রীড়া ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক মো: শামসুর রাজা চৌধুরী।

এছাড়াও এসময় মণিপুরী ললিতকলা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা প্রভাস চন্দ্র সিংহ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সভাপতি মঞ্জুর আহমদ আজাদ মান্না, সাধারণ সম্পাদক মো. আহাদ মিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক সজীব দেবরায়, নারীনেত্রী শেখ মনোয়ারা, আদিবাসী নেতা এলিসন সুঙ, সাংবাদিক বেলাল তালুকদার, পাহাড় রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির সভাপতি মোনায়েম খান, উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিরঞ্জন দেব, উপজেলা হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক অর্জুন শর্মা নিধু প্রমুখ।

ঐতিহাসিক মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২২তম বার্ষিকীতে বিভিন্ন সংগঠনের মানববন্ধন
মাগুরছড়া ট্রাজেডি

দীর্ঘ ২২ টি বছর কেটে গেলেও আদায় করা যায়নি ক্ষয়ক্ষতির টাকা।সেই ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত একের পর এক এসেছে নতুন সরকার। তবে ২২ বছর ধরেও কোন এক অদৃশ্য কারনে ক্ষয়ক্ষতির টাকা আদায় হয়নি যা সত্যিই রহস্যজনক।

উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে ১৪ জুন মধ্যরাতে মাগুরছড়ার ১নং গ্যাস কূপ খননকালে হঠাৎ করে ভয়াবহ বিষ্ফোরণ ঘটে।বিষ্ফোণের বিকট শব্দে কেঁপে উঠে কমলগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা।বিস্ফোরণের সাথে সাথে প্রায় ৫০০ ফুট উচ্চতায় লাফিয়ে উঠা আগুনের লেলিহান শিখায় লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল এই এলাকার চারিপাশ।সেই সময় আগুনের শিখায় গ্যাস ফিল্ড সংলগ্ন লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বন, মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, জীব বৈচিত্র্য, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, ফুলবাড়ী চা বাগান, সিলেট-ঢাকা ও সিলেট- চট্টগ্রাম রেলপথ এবং কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছিল।

দীর্ঘ ৬ মাস বন্ধ ছিল কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়ক ও আখাউড়া-সিলেট সরাসরি রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ ১৫ কিঃমিঃ (৩৩ হাজার কেভি) উচ্চতাপ বৈদ্যুতিক লাইন পুড়ে নষ্ট হয়। কুলাউড়া, বড়লেখা ও কমলগঞ্জ উপজেলার ৫০ টি চা বাগানে দীর্ঘদিন স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়। ৬৯৫ হেক্টর বনাঞ্চলের বৃক্ষ সম্পদ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এছাড়া ২০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়, যার বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৫০ কোটি ডলার। দূর্ঘটনার এক দুই বছরের মধ্যে জানা যায়, লাউয়াছড়া রিজার্ভ ফরেস্টের ৮৭ দশমিক ৫০ একর এলাকা গ্যাসের আগুনে ক্ষতি হয়। সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় ২০ দশমিক ৫০ একর এলাকা। এর মধ্যে ৪.৭৫ ঘনফুট গাছ-গাছালি, ৫৫ হাজার ২শ টি পূর্ণ বয়স্ক বাঁশ এবং ১ লাখ ১৫ হাজার অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাঁশ পুড়ে যায়। যার ক্ষতির পরিমান ৫ কোটি টাকা। এছাড়া ২৬ একরে বড় আকৃতির বহু সংখ্যক দামী বৃক্ষ সম্পুর্ন ও আংশিক পুড়ে যায়।

একইভাবে ৪১.৫০ একরের ২২.৮২৫ ঘনফুট গাছ-গাছালির আংশিক ক্ষতি ধরা হয়। সব মিলিয়ে পুড়ে যাওয়া গ্যাস, ক্ষতিগ্রস্থ বন ও পরিবেশের বিশাল ক্ষয়ক্ষতি আদায়ে মার্কিন কোম্পানিসমূহের টাল বাহানায় মাগুরছড়া গ্যাস কূপ বিস্ফোরনের ২০ বছরে ৩ টি কোম্পানির হাত বদল হয়েছে। কিন্তু পুরো ক্ষতিপূরণ আদায়ে কোন পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি।

মাগুড়ছড়া ট্রাজেডির রিপোর্টে বেরিয়ে আসে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি অক্সিডেন্টালের খামখেয়ালিপনা, দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও তাদের ত্রুটির কথা। ১৯৯৭ সালের জুন মাসে স্থানটি রাতারাতি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে পরিণত হয়। মাগুরছড়া গ্যাসফিল্ডে ভয়াবহ এ বিস্ফোরণে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।মার্কিন অক্সিডেন্টাল ক্ষয়ক্ষতির আংশিক পরিশোধ করলেও বন বিভাগ কোন ক্ষতিপূরণ পায়নি।

১৯৯৭ সালেরই ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবের কাছে দুটি ভলিউমে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়।পরে বিদুৎ, জ্বালানি ও খনিজ স¤পদ মন্ত্রণালয় স¤পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ, ক্ষতিপূরণ পাওয়া ও তা বিতরণের বিষয়ে তিন সদস্যের একটি সাব কমিটি গঠন করে। তদন্ত  কমিটি সাব-কমিটিকে জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অক্সিডেন্টালের ব্যর্থতার জন্যই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

কমিটির তদন্তে অক্সিডেন্টালের কাজে ১৫ থেকে ১৬টি ত্রুটি ধরা পড়ে। অক্সিডেন্টালের কর্মকর্তারা দুই থেকে তিনটি ত্রুটির বিষয়ে আপত্তি জানালেও বাকিগুলো স্বীকার করে তদন্ত রিপোর্টে সই করেন। কিন্তু গ্যাস ফিল্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি পরিশোধ না করেই কোম্পানির আরেক মার্কিন কোম্পানি ইউনিকলের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ইউনিকলও কিছুদিন কাজ করার পর ফের আরেক মার্কিন কোম্পানি শেভরনের কাছে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যায়।

এভাবে মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২২ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও ওই মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে আজও মেলেনি ক্ষতিপূরণ।

ক্ষতিপূরণ আদায়, কমলগঞ্জ উপজেলাবাসীর ঘরে ঘরে গ্যাস লাইন সরবরাহসহ বিভিন্ন দাবী নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে স্মারকলিপি প্রদান করে সংগঠনগুলো।

আপনার মতামত দিন