আল কুরআনের স্পর্শে বদলে যাক জীবন

0
62
আল কুরআনের স্পর্শে বদলে যাক জীবন
আল কুরআনের স্পর্শে বদলে যাক জীবন

আল কুরআন মহান আল্লাহর বাণীর অপূর্ব সমাহার বিস্ময়কর এক গ্রন্থের নাম। আল কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সংরক্ষিত এক সংবিধান। এই কুরআন যেমন সমগ্র মানবজাতির মানসিক সংশয়, সন্দেহ, অস্পষ্টতা, কুপ্রবৃত্তি, লোভ-লালসা নামক নানারকম রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের অব্যর্থ মহৌষধ ঠিক তেমনি দৈহিক রোগ-ব্যাধি, বেদনা, কষ্ট-ক্লেশ এবং জীবন চলার পথের সকল অন্ধকার বিদূরিত করার এক অনবদ্য নির্দেশিকা। এই কুরআন হল, সত্য-মিথ্যা এবং বৈধ-অবৈধের সীমা-রেখা নির্ধারণের এক সুউচ্চ মাইল ফলক, সুখ সমৃদ্ধ জীবনের বিশ্বস্ত ঠিকানা এবং পশ্চাদপদতা, দুর্ভাগ্য ও হতাশার গ্লানি থেকে মুক্তির অনুপম গাইড লাইন।

বিশ্ববাসীর প্রতি আল কুরআনের চ্যালেঞ্জঃ

আল কুরআন কিয়ামত পর্যন্ত অনাগত বিশ্বের এক চিরন্তন বিস্ময়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র মানব ও দানব জাতির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন-কুরআনের মত আরেকটি গ্রন্থ তারা সবাই মিলে রচনা করুক তো।

কিন্তু কাল প্রবাহে সবাই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।  ইরশাদ হচ্ছে: 
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَت الْأِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيراً
“বলুন, যদি মানব ও জিন সকলে কুরআনের অনুরূপ রচনা করার জন্য একত্রিত হয়, এবং তারা পরস্পরে সাহায্যকারী হয়; তবুও তারা এর অনুরূপ রচনা করতে পারবে না।” (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৮৮)

আবার চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে, পুরো গ্রন্থ নয়; কুরআনের মত দশটি সূরা তারা রচনা করুক তো। কিন্তু তাতেও সবাই ব্যর্থ হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে:
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ 

“তারা কি বলে কুরআন সে (অর্থাৎ নবী মোহাম্মাদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে তৈরি করেছে? আপনি বলে দিন, তবে তোমরাও অনুরূপ দশটি সূরা তৈরি করে নিয়ে আস। আর আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডেকে নাও। যদি তোমাদের কথা সত্য হয়ে থাকে।” (সূরা হুদ: ১৩)

আবারো চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করা হয়েছে, মাত্র একটি সূরা তারা রচনা করুক। কিন্তু এতেও  তারা ব্যার্থতার পরিচয় দিয়েছে । আল্লাহ তায়ালা বলেন: 
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِين 

“আমি আমার বান্দার নিকট যা অবতীর্ণ করেছি সে ব্যাপারে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে তবে এর মত একটিমাত্র সূরা রচনা করে নিয়ে আস তো। এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের অন্যান্য সাহায্যকারীদেরকেও ডেকে নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক।”(সূরা বাকারাঃ ২৩)

আল কুরআন বরকতময় এক গ্রন্থের নামঃ

যাবতীয় কল্যাণ, সর্বপ্রকার জ্ঞান-গরিমা, প্রজ্ঞা ও রহস্যের আধার হল আল কুরআন। একে অনুসরণ করেই দুনিয়া ও আখেরাতে পাওয়া যায় সুখের সন্ধান, মেলে সঠিক পথের দিশা। পক্ষান্তরে কুরআন থেকে দূরে থাকলে, কুরআনকে একমাত্র সংবিধান হিসেবে গ্রহণ না করলে নানারকম দুর্ভাগ্য, দুশ্চিন্তা, হতাশা, ব্যঞ্জনা ইত্যাদি মানব জীবনকে ঘিরে ফেলে, প্রতি পদে নেমে আসে গহীন অন্ধকার।

কুরআন দেয় নিজের পরিচয়ঃ

কুরআন সকল রোগের প্রতিষেধক এবং বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপঃ  আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনঃ وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ  لِلْمُؤْمِنِين  “আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের প্রতিষেধক এবং মুমিনদের জন্য রহমত।” (সূরা বানী ইসরাঈলঃ ৮২)।

সত্যের দিশারী এবং আলোকবর্তীকাঃ 

আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ “এই কুরআন দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালা যারা তাঁর সন্তষ্টি কামনা করে তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসেন এবং তাদেরকে প্রদান করেন সরল-সোজা পথের দিশা।” (সূরা মায়িদাহঃ ১৬)

সত্য পথের পথিকদের মহাপুরস্কারের শুভ সংবাদ দেয় কুরআনঃ ইরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ এ(জান্নাতেরই) শুভ সংবাদ প্রদান করে সে সব বান্দাকে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে। বলুন, আমি তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না। শুধু চাই আত্মীয়তাজনিত সৌহার্দ্য। কেউ উত্তম কাজ করলে আমি তার সোয়াব বৃদ্ধি করে দেই। আল্লাহ তো ক্ষমাকারী এবং গুণগ্রাহী।” (সূরা শূরাঃ ২৩)

 জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রজ্ঞার আধার: আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন:

ذَلِكَ نَتْلُوهُ عَلَيْكَ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيم

“আমি তোমাদেরকে এসমস্ত আয়াত এবং বিজ্ঞানময় উপদেশ বানী পড়ে শুনাই। (সূরা আলে ইমরান: ৫৮)

আত্বা ও জীবনের স্পন্দনঃ আল্লাহ বলেনঃ  وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحاً مِنْ أَمْرِنَا “এমনিভাবে আমি আমার নির্দেশক্রমে তোমার নিকট আত্মা সঞ্চারকারী বিষয় প্রেরণ করেছি। (সূরা শুরাঃ ৫২)

 সব কিছুর নির্ভুল তথ্য ও জ্ঞান দান করে আল কুরআন: আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন, “আর যত প্রকার প্রাণী পৃথিবীতে বিচরণশীল রয়েছে এবং যত প্রকার পাখি দু ডানা যোগে উড়ে বেড়ায় তারা তোমাদের মতই একেকটা জাতি। এই গ্রন্থে আমি কোন কিছুই লিখতে বাদ দেই নি। পরিশেষে সবাই তাদের প্রতিপালকের নিকট ফিরে আসবে।” (সূরা আনআমঃ ৩৮)

আল্লাহ নিজেই কুরআনের শপথ করে বলেছেন, তা অতি মর্যাদাবানঃ তিনি বলেনঃق وَالْقُرْآنِ الْمَجِيد  “ক্বাফ। শপথ এই মর্যাদাবান কুরআনের। (সূরা ক্বাফঃ ১)

আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাদেরকে কুরআন নিয়ে গবেষণা করার নির্দেশ প্রদান করে বলেছেন, যারা তা করে না তারা অন্ধ এবং বদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী। তিনি বলেন: 

أَفَلا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
“তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করে না? না তাদের অন্তর তালাবন্ধ?” (সূরা মুহাম্মাদঃ ২৪)

এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে, কুরআনের সম্মান কত বেশি!  কুরআন পাঠ করা, মুখস্থ করা, কুরআন নিয়ে গবেষণা করা, কুরআনের অর্থও মর্মবাণী উপলব্ধি করার চেষ্টা করা, একে নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করার মর্যাদা কত উন্নত!

সুতরাং এমন কে আছে যে এ মর্যাদা লুফে নিতে চায়? কোথায় কুরআনের হাফেযগণ? কোথায় কুরআন প্রেমিক তরুণেরা? কোথায় কুরআন পাগল ঈমানদার বন্ধুগণ? আসুন, এই কুরআনের আহবানে সাড়া দেই। কুরআনের রঙ্গে রাঙ্গিয়ে দেই আমাদের দেহ, মন সমাজ ও পরিবেশ। গড়ে তুলি ঐশী আলোয় আলোকিত এক সুন্দর পৃথিবী।

কুরআনরে মর্যাদাঃ

কুরআন শিক্ষা করা  এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়াঃ মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ قُلْ كَفَى بِاللَّهِ شَهِيداً بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ وَمَنْ عِنْدَهُ عِلْمُ الْكِتَابِ “বলুন, আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং  ঐ ব্যক্তি যার কাছে কিতাব (কুরআন)এর জ্ঞান আছ। (সূরা রা’দঃ ৪৩)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলছেনেঃ ((خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ  الْقُرْآنَ وَعَلَّمَه)) “তোমদের মধ্যে সেই উত্তম যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়। (সহীহ বুখারী)।

কুরআনের স্পর্শে বদলে যাক জীবনঃ

আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদ (রা:) বলেন, “ক্বারী তথা কুরআন প্রেমিক মানুষের তো এমন হওয়া উচিৎ, গভীর রাতে মানুষ যখন ঘুমের ঘোরে ডুবে থাকে তখন সে কুরআন তেলাওয়াত করে। দিনের বেলায় সবাই যখন খাবার-দাবারে লিপ্ত থাকে তখন সে কুরআন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সবাই যখন হাঁসি-তামাশায় মত্ত থাকে তখন সে আল্লাহর দরবারে চোখের পানিতে বুক ভাষায়। মানুষ যখন নির্বিঘ্নে সবার সাথে মিশে তখন সে পরহেযগারীতা অবলম্বন করে এবং ভালো মানুষ ছাড়া খারাপ মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকে। মানুষ যখন অন্যের দোষ চর্চা এবং অনর্থক আলাপচারীটায় সময় কাটায় তখন সে নীরবতার ভূমিকা পালন করে। মানুষ যখন দাম্ভিক এবং অহংকারপূর্ণ আচরণ করে তখন সে অতি নম্র ও ভদ্র স্বভাবের পরিচয় দেয়। অন্যেরা যখন আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকে তখন সে বিভোর থাকে পরকালের চিন্তায়।

হে আল্লাহ” হে পরম দয়ালু, তুমি আমাদেরকে কুরআনের আলোয় আলোকিত মানুষ বানাও। কুরআনের ছায়া তলে গড়ার তাওফিক দাও আমাদের ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, সংস্কৃতি অর্থনীতি সহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

লেখকঃ হাফিজ রিমন আহমদ তানিম

লেখকঃ হাফিজ রিমন আহমদ তানিম
শিক্ষার্থীঃ সৎপুর কামিল (এম.এ) মাদ্রাসা
বিশ্বনাথ. সিলেট.

আপনার মতামত দিন